চট্টগ্রাম, , মঙ্গলবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮

সুন্দরবনে শান্তি ফেরালেন যমুনা টিভির মহসিন উল হাকিম 

প্রকাশ: ২০১৮-০৪-২৩ ২০:২০:৩৯ || আপডেট: ২০১৮-০৪-২৩ ২০:২০:৩৯



তুহিন সানজিদ, নিউইয়র্ক :

বদলে গেছে সুন্দরবনের চিত্র। স্বস্তি ফিরে এসেছে উপকূলে। নেই অস্ত্রের ঝনঝনানি। জিম্মি, অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, হত্যা, চাঁদাবাজি আর ডাকাতি ছিল যেখানকার প্রতিদিনের নির্মম চিত্র, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যেখানে ছিল অসহায়, বহু বছর পর এখন সেখানে বইছে শান্তির সুবাতাস। দীর্ঘদিনের জিম্মিদশা থেকে মুক্তি পেয়েছে লাখ লাখ মানুষ।

প্রশাসন বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নয়, এ অসাধ্য সাধন করেছেন একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিক। তার প্রচেষ্টায় দু’বছরে প্রায় আড়াইশ’ জলদস্যু আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছেন। জমা দিয়েছেন ৩৫৩টি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র এবং ২০ হাজার রাউন্ড গুলি। একজন সাংবাদিকের মধ্যস্থতায় এত বেশি সশস্ত্র সন্ত্রাসীর আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার ঘটনা এটাই প্রথম, এ ধরনের ঘটনা বিশ্বেও বিরল।

তিনি বাংলাদেশের সংবাদভিত্তিক বেসরকারি স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল যমুনা টেলিভিশনের বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত। সুন্দরবন উপকূলের লাখো মানুষের মুখে হাসি ফিরিয়ে দেয়ায় দেশের সীমানা পেরিয়ে সারা বিশ্বে এখন আলোচিত হচ্ছে সাংবাদিক মোহসীন-উল হাকিমের নাম।

১০ হাজার বর্গকিলোমিটার জুড়ে গড়ে ওঠা সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশের আয়তন ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার। বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট হিসেবে খ্যাত সুন্দরবন উপকূলে প্রায় ৩০ লাখ মানুষের বসবাস। লক্ষাধিক মানুষ জীবন জীবিকা নির্ভর করে এই বনের ওপর। বছরের বেশিরভাগ সময় এই বনের মধ্যেই থাকতে হয় জেলে, বাওয়ালী আর কাঠুরিয়াদের। তাদের মোকাবেলা করতে হয় বাঘ, সাপসহ আরও অনেক হিং¯্র প্রাণীর। কিন্তু তার চেয়েও ভয়ঙ্কর ছিলো জলদস্যু। জীবিকার তাগিদে যারা সুন্দরবনে যায় কাঠ কাঁটতে, মাছ ধরতে বা মধু সংগ্রহ করতে, নিতান্তই দিনে আনা-দিনে খাওয়া এসব মানুষকে অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করতো জলদস্যুরা। প্রাণ রক্ষার্থে অনেকে ভিটেবাড়ি বিক্রি করে স্বজনদের ছাড়িয়ে আনতো জলদস্যুদের কাছ থেকে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে জানালে হত্যা করে লাশ নদীতে ভাসিয়ে দেয়া হতো।

এছাড়া দুবলার থেকে শুরু করে সমুদ্রের মাছ ব্যবসায়ি ও জেলেদের কাছ থেকে প্রতিবছর কয়েক কোটি টাকা আগাম চাঁদা আদায় করতো জলদস্যুরা। পাথরঘাটার ব্যবসায়িরা দিত বছরে ছয় কোটি টাকা। শরণখোলা ও মহিপুরের ট্রলার মালিকদেরও বছরে কয়েক কোটি টাকা চাঁদা দিতে হতো। শুধু তাই নয়, পুরো উপকূলীয় জেলাগুলোর সাগরে মাছ শিকারে যাওয়া ট্রলার মালিকদেরও চাঁদা দিতে হতো। আর চাঁদা না দিলে অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করতো এই দস্যুরা। কখনও দিনে শতাধিক অপহরণের ঘটনাও ঘটতো। উপকূলের একধরনের প্রভাবশালী ব্যক্তি ও জনপ্রতিনিধিরা দু’পক্ষের মধ্যে সমঝোতায় বিশেষ ভূমিকা পালন করতো।

বছরের পর বছর ধরে এ অভিশাপ থেকে মুক্তি পাচ্ছিল না ব্যবসায়ি, জেলে, মৌয়াল, কাঠুরিয়া আর উপকূলের লাখ লাখ মানুষ। সুন্দরবনে জলদস্যুদের এই রাজত্ব প্রায় তিন যুগ ধরে চলে আসছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সাড়াশি অভিযান চালিয়েও তাদের ধরতে পারে না। কারণ নদীপথে পুলিশ বা কোস্টগার্ড অভিযানে গেলেই তা জানতে পারে জলদস্যুরা। মোবাইলের মাধ্যমে খবর পেয়ে তারা নিরাপদ দূরত্বে চলে যেতে পারে।

বহু চেষ্টার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যেখানে ব্যর্থ সেখানে শান্তির দূত হয়ে আসে একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিক। ঘটনা কিংবা ঘটনার আড়ালের ঘটনা খুঁজে বেড়ানোই যার নেশা, তাকে পেয়ে বসে আরেক নেশায়। সে নেশা শান্তির নেশা, বিপথগামী কিছু মানুষকে স্বাভাবিক জীবনের পথে ফিরিয়ে আনার নেশা। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস গভীর সুন্দরবনে জলদস্যুদের ঢেরায় কাটিয়েছেন এই সাংবাদিক। ওইসব সন্ত্রাসীদের তিনি অন্ধকার পথ ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার জন্য বুঝিয়েছেন। একে একে ২০টি জলদস্যু বাহিনী আত্মসমর্পন করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছে। রচিত হয়েছে অন্যরকম ইতিহাস।

দস্যু জয়ের অবিশ্বাস্য কাহিনী এবং একজন মোহসীন-উল হাকিম

দস্যুমুক্ত হয়েছে সুন্দরবন। তবে দস্যুজয়ের অবিশ্বাস্য এই কাহিনীর শেষটা যেমন আনন্দের, শুরুটা তেমন ছিলনা। গহীন বনের মধ্যে গিয়ে একজন সাংবাদিকের পক্ষে সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের নিয়ে সরেজমিন রিপোর্ট করা ছিল যেমন ঝুঁকিপুর্ণ তেমনি তাদেরকে বুঝিয়ে অস্ত্র ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার জন্য তাদের মন জয় করার বিষয়টি ছিল আরো কঠিন ও বিপদজ্জনক। প্রতিটি পদে পদে ছিল বিপদ, অবিশ্বাস এমনকি মৃত্যুর ঝুঁকি। কিন্তু সবকিছু জয় করে অবিশ্বাস্য এক দস্যু জয়ের ইতিহাস গড়েছেন মোহসীন-উল হাকিম।

তিনি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সমস্যা ও সম্ভাবনা এবং প্রান্তিক মানুষের নানা ইস্যু নিয়ে কাজ করেন। পার্বত্য অঞ্চলের মানুষ ও প্রাণবৈচিত্র থেকে শুরু করে উত্তরের বিস্তীর্ণ জনপদ, হাওর-বাওর বেষ্টিত উত্তর পূর্বাঞ্চলের মানুষের জীবন ও দক্ষিণ পশ্চিম উপকূলীয় জনপদের কথা তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন সব সময়। বিশেষ করে সুন্দরবন উপকূলের সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করছেন বিগত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে।

২০০৯ সালে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ‘আইলা’র পর সাতক্ষীরার সুন্দরবন সংলগ্ন গ্রাম গাবুরার অসহায় মানুষদের নিয়ে কাজ করতে গিয়ে তিনি জানতে পারেন জলদস্যুদের বিষয়টি। ঘুর্ণিঝড় আইলা’য় ক্ষতিগ্রস্থ মানুষ তাকে জানান, ঝড়ের ক্ষতি তারা কিছুদিনের মধ্যে হয়তো সামলে উঠতে পারবেন কিন্তু তার চেয়ে বড় ঝড়ের নাম ‘জলদস্যু’। অভিশপ্ত এই ঝড় উপকূলের লাখ লাখ মানুষের জীবন ল-ভ- করে করে চলেছে বছরের পর বছর ধরে। নিষ্ঠুর সাইক্লোনে সব হারানো যে মানুষগুলো নদীর ধারে বেড়িবাঁধের ওপর খোলা আকাশের নীচে বসবাস করছে তাদের কাছে খাবার বা মাথা গোঁজার ঠাঁইয়ের চেয়ে বেশি প্রয়োজন


আর্কাইভ

MonTueWedThuFriSatSun
     12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
       
  12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
2728293031  
       
      1
2345678
23242526272829
3031     
    123
45678910
11121314151617
18192021222324
252627282930 
       
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031   
       
      1
9101112131415
23242526272829
30      
   1234
567891011
12131415161718
       
   1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728